অ্যান্টিবায়োটিকের অবাধ প্রয়োগে মারাত্মক হুমকির মুখে জনস্বাস্থ্য


২৪ ঘন্টা বার্তা   প্রকাশিত হয়েছেঃ   ২ মার্চ, ২০২১

দেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত প্রয়োগে জনস্বাস্থ্যে নানা জটিলতা বেড়েই চলছে। অবাধে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কমে আসছে মানবদেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা। পাশাপাশি হ্রাস পেয়েছে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতাও। দেশে রোগীদের ওপর রিজার্ভ (প্রচলিত নয় এমন) অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োগ বেড়ে গেছে। ফলে বাকি সব ধরনের ওষুধ দ্রুত কার্যক্ষমতা হারাতে বসেছে। ইতিমধ্যে রিজার্ভ অ্যান্টিবায়োটিকের বড় ৪টি ধরন ব্যাপকভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তার মধ্যে সেফেপিম নামক রিজার্ভ অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি, ৪৯ শতাংশ। তাছাড়া লিনেজোলিড ২৩ শতাংশ, টিজেসাইলিন ২০ শতাংশ ও কোলেস্টিন ৮ শতাংশ ব্যবহার করা হচ্ছে। ওসব রিজার্ভ অ্যান্টিবায়োটিক মেডিসিন, সার্জারি, আইসিইউ, বার্ন ও অন্যান্য ইউনিটে ব্যবহার হচ্ছে। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে কর্মরত অনেক চিকিৎসকই প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই রোগীদের ব্যবস্থাপত্র দেয়। ওই ব্যবস্থাপত্রে অ্যান্টিবায়োটিকও স্থান পায়। অথচ ব্যবস্থাপত্রে সঠিকভাবে রোগের বিবরণ উল্লেখ ছাড়াই ওষুধের কোনটি কী কারণে দেয়া হয়েছে তা রোগীকে জানানো হয় না। দেশের বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিতে আসা বেশির ভাগ রোগীর ক্ষেত্রেই এমন ঘটনা ঘটছে। সরকারের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের এক গবেষণাতেই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া ব্যবস্থাপত্র দেয়ার এমন প্রবণতার বিষয়টি উঠে এসেছে। ওই গবেষণা পরিচালনায় দেশের চার বিভাগের (ঢাকা, রাজশাহী, খুলনা ও চট্টগ্রাম) ৪টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, ৪টি জেলা হাসপাতাল, ৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ৮টি ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, ৮টি কমিউনিটি ক্লিনিক, ৪টি বেসরকারি হাসপাতাল এবং ১২টি ফার্মেসিতে আসা ৪৮০ জন সেবাপ্রত্যাশীর তথ্য সংগ্রহ করা হয়। তাছাড়া নীতিনির্ধারক, স্বাস্থ্য পেশাজীবী, চিকিৎসক, ওষুধবিক্রেতা, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ঔষধ প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং কৃষি, পশু ও মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তাসহ ১০৫ জনের সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ওসব তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। গবেষণায় ৪৬ ধরনের রোগের কথা উল্লেখ করা হলেও সবচেয়ে বেশি রোগী ছিলেন জ্বর, দুর্বলতা, সর্দি, ঠা-া লাগা, গলা ব্যথা, পাতলা পায়খানা ও মাথাব্যথার। ওসব রোগের ক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়েই উচ্চমাত্রার অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হয়। ফলে তাৎক্ষণিক উপশম হলেও তা মানবদেহের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সূত্র জানায়, দেশে সেকেন্ডারি ও টারশিয়ারি পর্যায়ের সরকারি হাসপাতালের সংখ্যা ৬১৮। যাতে ২৬ হাজার ৮৯২ জন চিকিৎসক সেবা দিয়ে থাকে। ২০১৮ সালে মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, জেলা হাসপাতাল, বিশেষায়িত হাসপাতাল, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্র, কমিউনিটি ক্লিনিকসহ সরকারি ব্যবস্থাপনায় প্রায় ৫ কোটি রোগীকে বহির্বিভাগে চিকিৎসা সেবা দেয়া হয়েছে। কিন্তু শুধু উপজেলা, ইউনিয়ন বা কমিউনিটি ক্লিনিক নয়, দেশের জেলা হাসপাতালগুলোতেই অনেক পরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। যদিও সংক্রামক ব্যাধির ক্ষেত্রে কিছু সরকারি মেডিকেল কলেজে পরীক্ষার ব্যবস্থা রয়েছে। আর বহুল পরিচিত সংক্রামক ব্যাধি নিরীক্ষণের জন্য কমিউনিটি ক্লিনিক পর্যায়ে ব্যবস্থা রয়েছে। কিন্তু বহির্বিভাগে আসা রোগীদের ক্ষেত্রে রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষার ব্যবস্থা একটি ব্যাপক বিষয়। সেজন্য বৃহৎ পরিসরে লোকবল ও ব্যবস্থা থাকা জরুরি। বহির্বিভাগের একজন রোগীকে দেখতে ৮-১০ মিনিট হলো আদর্শ সময়। কিন্তু রোগীর চাপে তা হয় না। তাছাড়া চিকিৎসকরা রোগের ধরন ও নাম উল্লেখ না করে ব্যবস্থাপত্র দেয়ায় রোগীদের অন্ধকারে থাকে। ৭৬ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে লিখিত ব্যবস্থাপত্র দেয়া হলেও ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে মৌখিক এবং ১৯ শতাংশের ক্ষেত্রে সরাসরি ওষুধ দেয়া হয়। তার মধ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকে সরাসরি ওষুধ দেয়া হয় ৫৯ শতাংশ রোগীর ক্ষেত্রে, ৫৫ শতাংশ ফার্মেসি সরাসরি ব্যবস্থাপত্র দেয়, ৪৫ শতাংশ ক্রেতাকে সরাসরি ওষুধ দেয়া হয়।
সূত্র আরো জানায়, সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগে একজন চিকিৎসক দিনে সর্বোচ্চ ৩০ জন রোগী দেখতে পারে। কিন্তু বাস্তবে কোনো কোনো সময় একজন চিকিৎসককে শতাধিক রোগীকে চিকিৎসা দিতে হয়। আর সব হাসপাতালে পরীক্ষার সুযোগ থাকে না। তাছাড়া সম্পদ ও লোকবলেরও সঙ্কট রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা সঠিকভাবে তার সমস্যা বলতে পারে না। আর পরীক্ষা ছাড়া রোগের সঠিক নির্ণয়ও সম্ভব নয়। তাই বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই উপসর্গভিত্তিক চিকিৎসা দেয়া হয়। তাছাড়া সব চিকিৎসার ক্ষেত্রে পরীক্ষা জরুরি নয়। গবেষণার তথ্যানুযায়ী, সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা ৬৩ শতাংশ, জেলা হাসপাতালে ৪৮ শতাংশ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫১ শতাংশ, ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রে ৫১ শতাংশ, কমিউনিটি ক্লিনিকে ৮৫ শতাংশ, বেসরকারি হাসপাতালে ৫৬ শতাংশ, ফার্মেসিতে ৭৮ শতাংশ এবং অন্যান্য চিকিৎসা দেয়া ব্যক্তিরা ৫০ শতাংশ রোগীদের ব্যবস্থাপত্রে রোগের নাম ও ধরন উল্লেখ করা হয় না। তাছাড়া পর্যাপ্ত অবকাঠামো সুবিধার অভাবে সরকারি হাসপাতালে রোগ নির্ণয়ে পরীক্ষা করা হয় না। ফলে সরকারি চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্রে উল্লেখিত পরীক্ষার বেশির ভাগ বেসরকারিভাবে করতে হয়। অনেক পরীক্ষা আবার অপ্রয়োজনীয়ও হয়ে থাকে। বেসরকারিভাবে পরীক্ষা করলে তাতে সরকারি চিকিৎসকরা কমিশন পায়। যদি নামমাত্র মূল্য নেয়ায় সরকারি ব্যবস্থাপনায় রোগের পরীক্ষা করা গেলে স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি ঘটতো।
এদিকে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসকদের মতে, সরকারি হাসপাতালে অনেক ভিড় থাকে এবং রোগীকেও নিরীক্ষণের তেমন সুযোগ দেয়া না। বহির্বিভাগের রোগীদের ক্ষেত্রে সময় ও সম্পদের স্বল্পতার কারণে পরীক্ষা করা সম্ভব হয় না। তাছাড়া ব্যবস্থাপনারও কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। চিকিৎসকস্বল্পতা ও অন্যান্য লোকবল সংকট না থাকলেও এমন হতো না।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক স্বাস্থ্য তথ্য ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইকিউভিআইএ’র হিসাবে, ২০২০ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এক বছরে বাংলাদেশে ওষুধ বিক্রি হয়েছে ২৪ হাজার ৫০৩ কোটি টাকার। তার মধ্যে ৩০ শতাংশের মতো ছিল অ্যান্টিবায়োটিক। ওই হিসাবে দেশে বছরে প্রায় ৭ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ প্রসঙ্গে গবেষক দলের সদস্য ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক ড. এ টি এম জাফরুল আজিম জানান, সবিশ্বের অন্যান্য দেশে প্রথমে প্রাথমিক পর্যায়ের অ্যান্টিবায়োটিক দেয়া হলেও বাংলাদেশে চূড়ান্ত মাত্রার দেয়া হয়। তাছাড়া পরীক্ষা ছাড়া ব্যবস্থাপত্র দেয়া মানে রোগের নাম ও ধরন উল্লেখ না করা। অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসের জন্যও রয়েছে এবং ব্যাকটেরিয়ার জন্যও রয়েছে। অ্যান্টিবায়োটিক শরীরে কাজ করবে কিনা তার জন্য পরীক্ষা দরকার। শুধু অ্যান্টিবায়োটিকের ক্ষেত্রে নয়, সব ওষুধের ক্ষেত্রে এমনটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ।