আজ ৩ এপ্রিল জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস


২৪ ঘন্টা বার্তা   প্রকাশিত হয়েছেঃ   ২ এপ্রিল, ২০২১

নিজস্ব প্রতিবেদক,ঋতু দে, খুলনা:::আজ জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস।২০১২ সাল থেকে প্রতিবছর এফডিসিতে বিপুল আয়োজন উদ্দিপনায় পালিত হয় এই দিবসটি।তবে করনার কারনে এবারের চিত্র একটু ভিন্ন। নেই কোন আয়োজন। বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বলতে ১৯৭১ সালের পর স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পকে বোঝালেও ১৯৪৭ এবং ৭১ পূর্ব পরাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাস ঐতিহ্য ও এর অন্তর্ভুক্ত।
কলকাতার ব্রেডফোর্ড বায়োস্কোপ কোম্পানির উদ্যোগে ১৮৯৮ সালের ৪ এপ্রিল তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার ভোলা মহকুমায় (অধুনা ভোলা জেলায়) বাংলাদেশে প্রথম বায়োস্কোপ প্রদর্শনী হয় ।এই বায়োস্কোপে দেখানো হত ছোট ছোট বিচ্ছিন্ন চলচ্চিত্র। আট আনা থেকে তিন টাকা টিকিটের বিনিময়ে সাধারণ জনগণ দেখতে পেত এই বায়োস্কোপ।হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭) দ্য রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানি গঠন করে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনী শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে সালে প্রতিষ্ঠিত এই দ্য রয়েল বায়োস্কোপ কোম্পানিই বাঙালির প্রথম চলচ্চিত্র-প্রচেষ্টা। অবিভক্ত বাংলার প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাতা হিসেবেও হীরালাল সেনের নাম স্বীকৃত। তবে
দাদাসাহেব ঢুণ্ডিরাজ গোবিন্দ ফালকে হলেন উপমহাদেশের প্রথম পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্রের নির্মাতা। ভারতীয় চলচ্চিত্রের ইতিহাসে তিনি দাদাসাহেব ফালকে নামেই বেশি পরিচিত।
ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্পাদনার দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই১৯৪৬ সালে বিশিষ্ট সাংবাদিক এবং প্রথম বাংলাদেশী মুসলিম পরিচালক ওবায়দুল কাদের হক করেন পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র দুঃখে যাদের জীবন গড়া। দেশভাগের পরে রাজধানী ঢাকায় চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য প্রযোজনা-পরিবেশনা প্রতিষ্ঠান এবং স্টুডিও নির্মাণের উদ্যোগ শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে নাজির আহমেদ (১৯২৫-১৯৯০) ইন আওয়ার মিডস্ট নামে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেন, যা বাংলাদেশ-ভূখণ্ডের প্রথম তথ্যচিত্র হিসেবে স্বীকৃত।জানা যায় ঢাকার পাটুয়াটুলী , জগন্নাথ কলেজ, ভিক্টোরিয়া পার্ক, আহসান মঞ্জিল এবং ঢাকার বাইরে মানিকগঞ্জ মহকুমার বগজুরি গ্রামে, গাজীপুর জেলা) ভাওয়াল এস্টেটের রাজপ্রাসাদে , ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার (অধুনা শরিয়তপুর জেলা) পালং-এ বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হত।১৯০০ সালে রাজশাহী শহরের বোয়ালিয়া জমিদার শরৎকুমার রায়ের বাড়িতেওবায়োস্কোপ দেখানো হয়েছিল বলে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক হিন্দুরঞ্জিকা পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের মাধ্যমে জানা যায়।১৯১৩ সালে ঢাকার আরমানিটোলার পাটের গুদাম থেকে বায়োস্কোপ প্রদর্শনীর গৌরবের অভিযাত্রা সূচিত হয় যা পরে ঢাকায় বাংলাদেশের প্রথম সিনেমা হল পিকচার হাউজ এবং পরবর্তীতে শাবিস্তান হল নামে রূপান্তরিত হয়।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের পরের বছর বছর সরকারি প্রচারচিত্র নির্মাণের জন্য জনসংযোগ বিভাগের অধীনে চলচ্চিত্র ইউনিট (১৯৫৩) গঠিত হয়। ১৯৫৪ সালে এখান থেকে নাজীর আহমদের পরিচালনায় নির্মিত হয় প্রামাণ্য চিত্র সালামত।
১৯৫৫ সালে নাজীর আহমদের উদ্যোগে ঢাকায় প্রথম ফিল্ম ল্যাবরেটরি এবং স্টুডিও চালু হয়। তিনি পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার প্রথম নির্বাহী পরিচালক হন। তার কাহিনি থেকে ফতেহ লোহানী নির্মাণ করেন বিখ্যাত চলচ্চিত্র আসিয়া (১৯৬০)। নবারুণ (১৯৬০) নামের একটি প্রামাণ্য চিত্র। নতুন দিগন্ত নামে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের পরিচালক ছিলেন নাজীর আহমদ।
১৯৫৪ সালে গঠিত হয় ইকবাল ফিল্মস এবং কো-অপারেটিভ ফিল্ম মেকার্স লিমিটেড।
১৯৫৪ সালে ইকবাল ফিল্মসের ব্যানারে এই ভূখণ্ডের প্রথম চলচ্চিত্র মুখ ও মুখোশ-এর কাজ শুরু করেন আবদুল জব্বার খান যা ১৯৫৬ সালের ৩ আগষ্ট মুক্তি পায়। ১৯৫৫ সালে জুন মাসে তেজগাঁওয়ে সরকারি ফিল্ম স্টুডিও চালু হয়।
১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন শিল্পমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধু, পরে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি) উত্থাপিত বিলের মাধ্যমে পূর্বপাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি) প্রতিষ্ঠিত হলে এর সহযোগিতায় ১৯৫৯ সালে থেকে প্রতিবছর চলচ্চিত্র মুক্তি পেতে থাকে। ১৯৫৭ এবং ১৯৫৮ সালে এদেশে কোনও চলচ্চিত্র মুক্তি পায়নি। এফডিসি ছাড়াও পপুলার স্টুডিও, বারী স্টুডিও এবং বেঙ্গল স্টুডিও বাংলাদেশের চলচ্চিত্র পরিস্ফুটনে বিরাট ভূমিকা পালন করে।
১৯৫৯ সালে ফতেহ লোহানীর আকাশ আর মাটি, মহিউদ্দিনের মাটির পাহাড়, এহতেশামের এদেশ তোমার আমার এই তিনটি বাংলা চলচ্চিত্র ছাড়াও এ.জে. কারদারের জাগো হুয়া সাভেরা নামে উর্দু চলচ্চিত্র নির্মিত হয়।
ষাটের দশকে সালাহ্উদ্দিনের যে নদী মরূপথে, সূর্যস্নান ও ধারাপাত প্রভৃতি সামাজিক চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন। জহির রায়হান এই সময়ের উল্লেখযোগ্য পরিচালক। তার যে নদী মরুপথে ও কখনো আসেনি, সোনার কাচের দেয়াল , সঙ্গম (উর্দু ১৯৬৪), বাহানা (উর্দু, ১৯৬৫) এই সময়ের উজ্জ্বল সৃষ্টি। উর্দু চলচ্চিত্রের দিকে ঝুঁকেও তিনি আবার চোখ ফেরালেন লোকজ কাহিনির দিকে। এরপর তিনি আনোয়ারা নির্মাণ করেন। জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০), লেট দেয়ার বি লাইট (১৯৭০) (অসমাপ্ত), স্টপ জেনোসাইড (১৯৭১) ও এ স্টেট ইজ বর্ন (১৯৭১) চলচ্চিত্র গুলো ছিল বহিরবিশ্বের চলচ্চিতের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মত।
ষাটের দশকেই কীর্তিমান পরিচালক হিসেবে আবির্ভূত হন খান আতাউর রহমান (১৯২৯-১৯৯৭)। তিনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে কেবল পরিচালক নন, অভিনেতা, কাহিনিকার, কণ্ঠশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার হিসেবে খ্যাতিমান। তার পরিচালিত রাজ সন্ন্যাসী, আবার তোরা মানুষ হ, সুজন সখী, দিন যায় কথা থাকে, ডানপিটে ছেলে (১৯৮০), এখনও অনেক রাত প্রভৃতি চলচ্চিত্র বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে উচ্চ আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। চলচ্চিত্রে অবদানের স্বীকৃত-স্বরূপ তিনি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছাড়াও পাকিস্তান, মস্কো এবং তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসব পুরস্কার লাভ করে।
স্বাধীনতার বছর ১৯৭১ সালে এদেশে ৮টি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়। এর মধ্যে নজরুল ইসলামের স্বরলিপি, অশোক ঘোষের নাচের পুতুল, আলমগীর কুমকুমের স্মৃতিটুকু থাক এবং খান আতাউর রহমানের সুখ দুঃখ সামাজিক চলচ্চিত্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগের প্রধান হিসেবে আবদুল জব্বার খান কাজ করেন। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য তিনি বাচসাস পুরস্কার, এফডিসি রজত জয়ন্তী পদক, উত্তরণ পদক, হীরালাল সেন স্মৃতি পদক, বিক্রমপুর ফাউন্ডেশন স্বর্ণপদক, চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সম্মান পদক, ফিল্ম আর্কাইভ সম্মান প্রতীক ও রেইনবো ফিল্ম সোসাইটি সম্মান পদক লাভ করেন।
১৯৭২ সালে আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা, সুভাষ দত্তের বলাকা মন, ঋত্বিক ঘটকের তিতাস একটি নদীর নাম বাংলা চলচ্চিত্রকে দান করেছে এক উজ্জ্বল ভবিষৎ। স্বাধীনতা পরবর্তী চলচ্চিত্র হলো ধীরে বহে মেঘনা , সূর্য কন্যা , সীমানা পেরিয়ে , রূপালী সৈকতে , মোহনা ,পরিণীতা ।আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশিয় চলচ্চিত্রকে অন্যমাত্রা দান করেন গুনী পরিচালক তারেক মাসুদ। ২০০২ সালে তারেক মাসুদ পরিচালিত মাটির ময়না বিশ্বের সবচেয়ে বড় ফিল্ম ফেস্টিভাল ‘কান ফিল্ম ফেস্টিভাল’ এ ডিরেক্টর’স ফোর্টনাইট ক্যাটাগরিতে মনোনীত ও প্রদর্শিত হয় এবং ২০০৩ সালে ছবিটি সেরা বিদেশী ভাষার চলচ্চিত্র বিভাগে একাডেমি পুরস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য পেশ করা হয়। চূড়ান্ত পুরস্কারের জন্য মনোনীত না হলেও এটিই প্রথম বাংলাদেশী ছবি যা অস্কারে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য প্রেরণ করা হয়। এরপর দুই বছর কোন বাংলাদেশী ছবি অস্কারের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করলেও ২০০৬ সাল থেকে প্রতি বছরই বাংলাদেশ থেকে একটি চলচ্চিত্র অস্কারের জন্য পেশ করা হচ্ছে। ২০০৬ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত পেশ করা সিনেমা তিনটি হচ্ছে হুমায়ূন আহমেদের শ্যামল ছায়া, আবু সাইয়িদের নিরন্তর এবং গোলাম রাব্বানী বিপ্লবের স্বপ্নডানায়। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ থেকে পেশ করা হয়েছে মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর ‘ডুব’ চলচ্চিত্রটি।এছাড়া সমাদৃত ছবির মধ্যে রয়েছে নাসিরুদ্দিন ইউসুফের গেরিলা, মোস্তফা সরোয়ার ফারুকীর টেলিভিশন, অমিত আশরাফের উধাও এবং দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচিত-সমালোচিত ছবি রুবাইয়াত হোসেনের মেহেরজান।বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগৎ আলোকিত হয়েছে চিরসবুজ দর্শকনন্দিত হাজার হাজার সিনেমায়।যা উপহার দিয়েছেন আমাদের বহু কিংবদন্তি মহানায়ক মহানাইকারা।বাংলা তথা বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাস ঐতিহ্য ব্যাপক সমৃদ্ধ এবং প্রসিদ্ধ।সেই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে ও নির্মাতারা পিছিয়ে নেই।নির্মিত হচ্ছে বিভিন্ন দর্শক নন্দিত সিনেমা। সুষ্ঠু ধারা বজায় রেখে এগিয়ে যাচ্ছে আমাদের দেশি সিনেমা।