করোনার থাবা ও কঠোর শর্ত আরোপে ব্যাপকভাবে কমেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি


২৪ ঘন্টা বার্তা   প্রকাশিত হয়েছেঃ   ২৪ জুলাই, ২০২০

এক্সক্লুসিভ:::ব্যাপকভাবে কমে গেছে সঞ্চয়পত্র বিক্রি। মূলত করোনা প্রাদুর্ভাবে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সঙ্কট এবং সরকারের নানা রকম কঠোর শর্তের কারণেই সঞ্চয়পত্র বিক্রির এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিদায়ী অর্থবছরের (২০১৯-২০) প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) সঞ্চয়পত্র বিক্রির নিট পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ১১ কোটি টাকা। অথচ আগের অর্থবছরের একই সময়ে এর পরিমাণ ছিল ৪৬ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা। ওই হিসাবে ১১ মাসে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে ৩৫ হাজার ৭০২ কোটি টাকা, যা ৭৬ শতাংশের কিছুটা বেশি। জাতীয় সঞ্চয় অধিদফতর সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, করোনার প্রাদুর্ভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ বেকার হয়ে পড়েছে। আবার অনেকের চাকরি আছে কিন্তু বেতন পাচ্ছে না। এমন অবস্থায় ওসব শ্রেণি-পেশার মানুষের পক্ষে সঞ্চয় তো দূরের কথা, উল্টো জমানো অর্থ ভেঙ্গে চলতে হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত করতে সুদহার না কমিয়ে নানা শর্ত জুড়ে দিয়েছে। বিগত কয়েক বছর সঞ্চয়পত্রের অস্বাভাবিক বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় এ খাতের ওপর বেশ কয়েকটি বিধিনিষেধ আরোপ করে সরকার। আগে সঞ্চয়পত্র কেনার জন্য কোনো ক্রেতাকে কর শনাক্ত নম্বর বা ই-টিআইএন জমা দিতে হতো না। কিন্তু এখন এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে তা বাধ্যতামূলক। ওসব কারণেও সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে গেছে।
সূত্র জানায়, বিদায়ী অর্থবছরে (২০১৯-২০) সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি কমেছে ৭৬ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আর একক মাস হিসেবে চলতি বছরের মে মাসে ৩ হাজার ২২৭ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে মূল ও মুনাফা পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ৭৯৬ কোটি টাকা। ফলে মাসটিতে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি ৪৩০ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। মূলত আইনগত কড়াকড়ি এবং মহামারী করোনার সঙ্কট এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং আয়করের হার বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি আরো কিছু শর্ত জুড়ে দেয়ায়ও সঞ্চয়পত্র ক্রয়ে অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। এখন সহজে সঞ্চয়পত্র কেনা যায় না।
সূত্র আরো জানায়, সঞ্চয়পত্রে বড় বিনিয়োগে কঠোর হয়েছে সরকার। ভবিষ্যৎ তহবিল বা প্রভিডেন্ট ফান্ডের অর্থে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ নেই। আর অনলাইনে মনিটর করায় সীমার অতিরিক্ত বা একই নামে বিভিন্ন জায়গা থেকে সঞ্চয়পত্র কেনার সুযোগ নেই। ওসব কারণে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে। ২০১৯-২০ অর্থবছরের (জুলাই-মে) ১১ মাসে ৫৭ হাজার ৮০৪ কোটি ৯৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। তার বিপরীতে মূল পরিশোধ হয়েছে ৪৬ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা। মূল অর্থ পরিশোধের পর অবশিষ্ট অর্থ নিট বিক্রি হিসেবে গণ্য হয়। ওই হিসেবে আলোচিত সময়ে নিট বিক্রির পরিমাণ ১১ হাজার ১১ কোটি টাকা। একই সময়ে আগের অর্থবছরে (২০১৮-১৯) সঞ্চয়পত্র বিক্রির পরিমাণ ছিল ৬৩ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা এবং নিট বিক্রি ছিল ৪৬ হাজার ৭১৩ কোটি টাকা।
এদিকে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমে যাওয়ায় ৭ বছর পর সরকার সংশোধিত বাজেটে সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেয়ার পরিমাণ অর্ধেকের বেশি কমিয়ে এনেছে। গত অর্থবছরে (২০১৯-২০) মূল বাজেটে সঞ্চয়পত্র খাতে ঋণ গ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা ২৭ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে ১১ হাজার ৯২৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়। অর্থাৎ ১৫ হাজার ৭৬ কোটি টাকা কাটছাঁট করা হয়। তাছাড়া চলতি অর্থবছরের (২০২০-২১) প্রস্তাবিত বাজেটে ঘাটতি ধরা হয়েছে ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। বিশাল ঘাটতি মেটাতে এবার সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্য ঠিক করেছে সরকার। কিন্তু প্রথম দিকে সরকারের কড়াকড়ি পরে করোনায় অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে সঞ্চয়কারীরা। অনেকে ঢাকা ছেড়ে চলে যাচ্ছে। কেউবা আগের বাসা ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম ভাড়ায় বাসা নিচ্ছে। এভাবে যেখানে বাসা ছেড়ে দিতে হচ্ছে সেখানে সঞ্চয়ের তো কোনো সুযোগ নেই। ওসব কারণে অস্বাভাবিক হারে সঞ্চয়পত্র বিক্রি কমেছে।