খোলা আকাশের নীচে পুলিশ হরতাল নয় টার্গেট ছিল পুলিশ


২৪ ঘন্টা বার্তা   প্রকাশিত হয়েছেঃ   ২৯ মার্চ, ২০২১

অনলাইন ডেস্ক:::গত রোববার হেফাজতের তান্ডবে সরাইলের বিশ্বরোড মোড়ের খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার সবকিছুই পুড়ে ছাঁই হয়ে গেছে। থানার ভেতরে কিছুই নেই। ইটপাটকেলে ভরে আছে থানার চত্বর। সেই দিনের ভয়াবহ তান্ডবে থানার অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। পুলিশের ব্যবহৃত গাড়ি, আর্মস্ পুলিশ কার (এপিসি), অস্ত্র, গুলি, ঘুমানোর বেড, রেকর্ডপত্র, আসবাবপত্র, আটককৃত মটরবাইক সহ সবকিছুই পুড়েছে। পুড়িয়েছে গাড়ি রাখার ডাম্পিংও। পুড়া থেকে রেহায় পায়নি থানা সংলগ্ন ৬টি দোকান। নগদ টাকা, কম্পিউটারসহ অনেক গুরূত্বপূর্ণ জিনিষপত্র হয়েছে লুটপাট। আত্ম রক্ষার্থে পুলিশ চালিয়েছেন গুলি। গুলিবিদ্ধ হয়েছে ৮জন। এরমধ্যে ২ জন মারা গেছে। বর্তমানে পড়নের কাপড় ছাড়া আর কিছুই নেই ওই থানার পুলিশ সদস্যদের। তাই তারা এখন খোলা আকাশের নীচে। গত রোববার হামলার পর থেকে গতকাল এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত থানার কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট উদ্ধৃতন কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। মামলার প্রস্তুতি চলছে।
গতকাল সোমবার সরেজমিনে দেখা যায়, ভয়াবহ এক নৃশংষতা। থানা নয় যেন এক মহাধ্বংসযজ্ঞ। খাঁিটহাতা হাইওয়ে থানাটি সেখানকার একটি মার্কেটে অবস্থিত। থানা কম্পাউন্ডের নেই কোন নিরাপত্তা বেষ্টনি। ৭-৮ কক্ষের পুরোটাই পুড়ে ছাঁই। বিছানা, কাজের টেবিল, ফাইল কেবিনেট, আলমীরা, সিলিংফ্যান ও ফ্রিজ সব কিছুই পুঁড়ে ছাঁই হয়ে গেছে। প্রত্যেকটি কক্ষে শুধু ছাঁই। অফিসার ইনচার্জের কক্ষে সাটানো জাতীর পিতা ও প্রধানমন্ত্রীর ছবিও পুড়ে ফেলেছে। পুড়িয়ে দিয়েছে পুলিশের ব্যবহৃত সরকারি পিকআপ ভ্যান ও প্রাইভেট একটি লেগুনা গাড়ি। তারা প্রথমেই আগুন দিয়েছে আর্মস্ পুলিশ কারে (এপিসিতে)। হেফাজতের হামলা থেকে রেহায় পায়নি থানার ডাম্পিংও। দ্বিতীয়তলায়ও কিছুই নেই। আগুনে জ্বালানোর পাশাপাশি তারা লুটপাটের রাজত্বও কায়েম করেছে। থানার দুই পাশের ৬টি দোকানেও আগুন দিয়েছে। দরিদ্র পরিবারের ওইসব দোকানিরাও এখন নি:স্ব। গত রোববারের তান্ডবের পর থেকে ওই থানার ৩৫ জন পুলিশ সদস্য যাযাবরের মত চলছেন। রোববার সমগ্র দিন সরাইল থানায়। আর রাত্রি যাপন করেছেন ভৈরবে। আর গতকাল দুপুরে দেখা গেছে থানার পাশে খোলা আকাশের নীচে বসে আছেন তারা। একে অপরের সাথে বিভিষীকাময় তান্ডবের বর্ণনা দিচ্ছেন। তবে থানার পুরা কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। মার্কেটের মধ্যে থানার কার্যক্রম চালাতে অনীহা প্রকাশ করছেন পুলিশ সদস্যরা। সেই সাথে তারা সেখানে নিরাপত্তাহীনতার কথা বলাবলি করছেন। পুলিশ জানায়, হরতালের দিন ভোর বেলা থেকেই হেফাজতের লোকজন ছিল এগ্রিসিভ। খাঁিটহাতা থানার ৩৫ জন ও রাঙ্গামাটি পুলিশ লাইন থেকে আসছে ৫০ জন। মোট ৮৫ জন পুলিশ সদস্য সেখানে অবস্থান করছিল। অবস্থা বুঝে কোন পুলিশ সড়কে যায়নি। ভোর থেকে ইচ্ছেমত পিকেটিং করছিল হেফাজত সদস্যরা। হরতালের ঘোষণা থাকলেও তারা মহাসড়কে করছিল বিক্ষোভ মিছিল। মিছিলে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামীলীগকে নিয়ে অশ্লীল স্লোগান দিচ্ছিল। সড়কে জ্বালিয়ে দিচ্ছিল আগুন। সড়কে কোন যানবাহন পেলেই জ্বালিয়ে দিচ্ছিল। আর অপরিচিত পথচারী পেলেই মারধর। বেলা বাড়ার সাথে বাড়তে থাকে লোকজনের উপস্থিতি। সকাল ১০টার দিকে মহাসড়কে ৮-১০ হাজার লোক জড়ো হয়। এদের মধ্যে কিশোর ও শিশুর সংখ্যাই বেশী। অধিকাংশের হাতে সাইজ করা লাঠি, হকি ষ্টিক ও দা। ১১টার দিকে জোট বেধেঁ থানায় হামলা চালায়। লুটপাটের পাশাপাশি আগুন দেয়। পুলিশ বের হয়নি। এটা যেন তাদের সহ্য হচ্ছে না। ক্রমেই তারা বেপরোয়া হতে থাকে। এক সময় মনে হল হরতাল নয়, তাদের টার্গেট পুলিশকে মারা। নিরূপায় হয়ে পুলিশ সদস্যরা গুলি ছুঁড়তে থাকে। ৪ শতাধিক গুলি ছুঁড়ে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেনি। এর আগে মহাসড়কের এক জায়গায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও ২ শতাধিক গুলি ছুঁড়েছেন। এরপর উর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের পরামর্শে কৌশলে সরাইল থানায় চলে যায়। কর্তৃপক্ষের নির্দেশে রোববার সন্ধ্যার পর থানায় গেলেও রাত্রি যাপন করতে হয়েছে ভৈরবে। রোববারের ঘটনায় সেখানে অর্ধশতাধিক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। গতকাল সকালে থানা পরিদর্শন করতে আসেন চট্রগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মো. আনোয়ার হোসেন, এডিশনাল ডিআইজি মো. জাকির হোসেন। আর বিকেল ৩টায় আসেন হাইওয়ে পুলিশ সুপার মো. শহিদ উল্লাহ। তখনও থানার ক্ষতিপূরণের তালিকা তৈরীর কাজ চলছিল।
গুলিবিদ্ধ ৭ জন ঢাকায়:
হেফাজতের তান্ডবে পুলিশের গুলিতে আহত হয় ৯ জন। এর মধ্যে কালন মিয়া (২২) ও আল-আমীন (১৪) মারা যায়। হাসপাতালসূত্র জানায়, সরাইলের নোয়াগাঁও গ্রামের প্রিতম (২৭), আলম (৩২), গ্যালমান (১০), মাসুম (২০), তেরকান্দা গ্রামের সাইমন (২৩), সরাইল সদর ইউনিয়নের পূর্ব কুট্রাপাড়া গ্রামের হাবিব (২৬) ও মোগলটুলার ইমন (১৭) গুলিবিদ্ধ হয়ে সরাইল থানায় গেলে চিকিৎসকরা উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদেরকে জেলা সদর হাসপাতালে রেফার করেন। তাদের অনেকেই জেলা সদরে না গিয়ে ঢাকায় চলে যায়। কেউ কেউ জেলা সদর হয়ে ঢাকায় গেছেন। এদের মধ্যে হাবিব বুকের মাঝখানে গুলিবিদ্ধ হয়েছে।
নিজেদের রোগী বহনকারী এ্যাম্বোলেন্স ভাংচুর:
হরতালকারী হেফাজতের লোকজন পুলিশের গুলিতে আহত তাদের নিজেদের রোগী বহনকারী এ্যাম্বোলেন্সে হামলা চালিয়েছে। ভাংচুর করেছে সরাইল সরকারী হাসপাতালের এ্যাম্বোলেন্সের সামনের ও পেছনের গ্লাসটি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন সরাইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: মো. নোমান মিয়া। খাঁটিহাতা হাইওয়ে থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) গাজী মো. শাখাওয়াৎ হোসেন ও সরাইল থানার অফিসার ইনচার্জ এএমএম নাজমুল হোসেন বলেন, শুধু হেফাজত নয়। সিভিল ড্রেসের যুবক কিশোর ও শিশু গুলি কোন দলের। এর পেছনে গভীর কোন ষড়যন্ত্র রয়েছে। এটা পরিকল্পিত হামলা। তাদের টার্গেট হরতাল করা নয়, পুলিশকে মারা। সরকারকে বেকায়দায় ফেলানোর হীন ষড়যন্ত্র।