নেসকোর প্রিপেইড মিটারে পদে পদে গ্রাহকের ভোগান্তি


২৪ ঘন্টা বার্তা   প্রকাশিত হয়েছেঃ   ২২ মার্চ, ২০২১

মহম্মদ সাজিরুল ইসলাম লিংকন,রাজশাহী প্রতিনিধি::রাজশাহী মহানগরীর শিরোইল এলাকার বাসিন্দা ফিরোজা বেগম। গত ২৩ জানুয়ারি তার বাড়িতে লাগানো হয় প্রিপেইড মিটার। কিন্তু লাগানোর পর থেকেই বাড়ে ভোগান্তি। তিনি বলেন, গত ২৩ জানুয়ারি আগাম ঘোষণা না দিয়েই বাসায় এসে মিটার লাগানো হয়। ওইদিন দুপুর বেলা হুট করেই বাসার বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রায় ঘন্টাখানেক পর আবারও বিদ্যুৎ আসে। কিছুক্ষণ পর এক ছেলে এসে জানায়, বাসায় প্রিপেইড মিটার লাগানো হয়েছে এসে ‘বুঝে নেন’।

তারপর সেখানে গিয়ে দেখা যায়, বাসার পাঁচটা মিটার পাঁচটাই প্রিপেইড মিটার লাগানো হয়েছে। কার অনুমতি নিয়ে প্রিপেইড লাগানো হল এমন প্রশ্ন করলে তারা উত্তর দেয়, নেসকো থেকে নির্দেশ আছে আমরা কন্ট্রাকে কাজ করতে এসেছি। প্রতিটা বাসার লিস্ট দেয়া হয়েছে। তাই প্রতিটা বাসায় গিয়ে প্রিপেইড লাগানো হচ্ছে।

ফিরোজা বলেন, তারা একটা লিফলেট ও কনজ্যুমার নাম্বার দিয়ে বলে যায়, যখন রিচার্জ করবেন এই নাম্বার ব্যবহার করতে হবে। তাদের কথা মতো সেদিনই ৫০০ টাকা রিচার্জ করা হয়। কিন্তু ওই টাকা মাত্র সপ্তাহখানেক যায়। এরপর আবারও ৫০০ টাকা রিচার্জ করা হয়। একই অবস্থা। একদিন রাতে হুট করে বিদ্যুৎ চলে গেলে ওদের কথা মতো ধার নেয়া হয়।

সে সময় তারা জানিয়েছিলো বিদ্যুৎ চলে গেলে ২০০ টাকা পর্যন্ত ধার দেয়া হবে পরবর্তীতে রিচার্জ করলে টাকা কেটে নিবে। কিন্তু সেই ধারের টাকা তিনদিন পর শোধ করার জন্য ৫০০ টাকা রিচার্জ করা হয়। ব্যালেন্স দেখার জন্য ডায়াল করা হলে মাইনাস ৬৫২ টাকা দেখায়। তারপর আবার ৮০০ টাকা রিচার্জ করলে ১০৮৯ টাকা মাইনাস দেখায়। উপায় না দেখে তাদের নেসকোর হেল্পলাইনে কল দিয়ে বিস্তারিত জানালে তড়িঘরি করে এসে লাইন ঠিক করে দিয়ে চলে যায়। পরে ব্যালেন্স চেক করে দেখা যায় মাত্র ৩২৫ টাকা আছে।

আগের মিটারে প্রতিমাসে বিল কত আসতো এমন প্রশ্ন করা হলে ফিরোজা বেগম বলেন, আগের মিটারে গরমের সময় ১৫০০ থেকে দুই হাজার টাকা আসতো। আর শীতের সময় হাজারের নিচে বিদ্যুৎ বিল থাকতো। তিনি বলেন, একমাসেই প্রায় তিন হাজার টাকার মতো রিচার্জ করা হয়েছে। কিন্তু জানুয়ারি আর ফেব্রুয়ারি মাসে এত টাকা বিল আসতো না। সামনে তো গ্রীষ্মকাল পড়েই আছে।

গ্রাহকদের অভিযোগ, এই মিটার স্থাপনের পর থেকে তাদের বিদ্যুৎ বিল বেড়ে গেছে। এছাড়া নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে টাকা রিচার্জ করতে ব্যর্থ হলে বৈদ্যুতিক সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন গ্রাহকেরা। পাশাপাশি সার্ভার সমস্যার কারণে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার নিয়ে ভোগান্তিতে পড়ছেন গ্রাহকরা। তারা বলছেন, নেসকোর এই মিটার এখন গলার কাঁটা হয়েছে।

গ্রাহকদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে অবিলম্বে নতুন মিটার অপসারণের দাবি জানিয়েছেন সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা। তবে কর্তৃপক্ষের দাবি, গ্রাহক সেবা বাড়াতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

জানুয়ারিতে নগরীর টিকাপাড়া, সাগরপাড়া, শিরোইল, আলুপট্টি, কাজিহাটা, সাহেববাজারসহ কিছু এলাকায় স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপন করে নর্দান ইলেকট্রিসিটি পাওয়ার কোম্পানি। এরপর প্রি-পেইড মিটারের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠেন রাজশাহীবাসী। রাজশাহী মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে গণশুনানির আগে প্রি-পেইড মিটার না বসানোর জন্য নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেডের (নেসকো) প্রতি আহ্বান জানানো হয়।

এরই মধ্যে নগরীতে ২ হাজার ১০০ গ্রাহকের বাড়িতে স্মার্ট প্রিপেইড মিটার স্থাপন করেছে নর্দান ইলেকট্রিসিটি পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড। তাদের গ্রাহক সংখ্যা ২ লাখ ১৭ হাজার।

মহানগরীর সাগরপাড়া এলাকার আবদুল খালেকের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। তার প্রতিষ্ঠানে প্রিপেইড মিটার লাগানো হয় ২০ জানুয়ারি। এরপর থেকে শুরু হয় তার ভোগান্তি। তিনি বলেন, প্রিপেইড মিটার লাগানোর আগে কোন চিন্তা ছিলো না। আর এখন সবসময় চিন্তা হয় এই বুঝি বিদ্যুৎ চলে গেলো। তিনি আরও বলেন, আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে প্রতিমাসে ৮০০ থেকে হাজার টাকা বিল আসতো। কিন্তু গত আড়াই মাসে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার টাকা রিচার্জ করা হয়। তারপরও আতঙ্কে থাকতে হয়। মিটার রিচার্জ করলে খুব দ্রুতই ব্যালেন্স শেষ হয়ে যায়। আবারও রিচার্জ করতে হয়।

নগরীর ঘোড়ামারা এলাকায় একটি করপোরেট অফিস। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সে অফিসের কর্মকর্তারা জানান, তাদের অফিসটি আবাসিক ভবনে অবস্থিত। ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে গরম শুরু হলে প্রিপেইড মিটারে এক হাজার টাকা রিচার্জ করে একটি এয়ারকন্ডিশনার (এসি) চালানো হয়। প্রায় ঘণ্টাখানেক চালানোর পর বিদ্যুৎ চলে যায়। তারপর আবার রিচার্জ করে এসি বন্ধ রাখা হয়। এরপর থেকে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেয়ার ভয়ে আর এসি চালানো হয়নি।

তবে এসব বিষয় অস্বীকার করেছেন নেসকোর স্মার্ট প্রি-পেমেন্ট মিটারিং প্রজেক্টের প্রকল্প পরিচালক মাহবুবুল আলম চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রিপেইড মিটারে বেশি টাকা কেটে নেয়ার কোন সুযোগ নেই। আগে যেভাবে চলতো এখনও সেভাবেই চলবে প্রিপেইড মিটার। পার্থক্য শুধু আগের মিটারে ব্যবহারের পরে বিল দিতে হতো এখন রির্চাজ করে বিদ্যুৎ নিতে হয়। অনেকটাই মোবাইলফোনের মতো। তিনি আরও বলেন, প্রিপেইড মিটার নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় সচেতনতা চালানো হচ্ছে। এতে ভোগান্তি নেই।