বরিশালে গণপরিহনে পত্রিকার স্টিকার লাগিয়ে চাঁদাবাজির অভিযোগ


২৪ ঘন্টা বার্তা   প্রকাশিত হয়েছেঃ   ৪ মার্চ, ২০২১

অনলাইন ডেস্ক: বরিশালের অভ্যন্তরীণ সড়কপথে ছোট পরিসরের গণপরিবহনের সামনে পিছনে লাগানো থাকে বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকার ও টিভি চ্যানেলের চটকদার স্টিকার। দেখলে মনে হয় প্রচারমূলক বিজ্ঞাপন। স্টিকার লাগানো এই গাড়িগুলো দেখলে সড়কে দায়িত্বরত সার্জেন্ট এবং পরিবহন শ্রমিকরাও সমীহ করতে দেখা যায়। এই রহস্য অনুসন্ধানে নামলে বেরিয়ে আসে অন্তরালের খবর। আসলে প্রচার নয়, প্রশাসনিক হয়রানি এবং পরিবহন শ্রমিকদের চাঁদা যেনো না দিতে হয়, তার সতর্কস্বরূপ প্রতিকী হিসেবে এই স্টিকার সাঁটানো হয়ে থাকে। বিশেষ করে মাহিন্দ্র ও সিএনজি মালিকপক্ষ মিডিয়াকর্মীদের ব্যবহার করে সড়কপথে নিজেদের গাড়িগুলো নিয়ে নির্ঝঞ্জাট থাকতেই এই কৌশল নিয়েছে। বিপরীতে মিডিয়াকর্মীদের দেওয়া হয় মাসিক “বিটমানি”। অর্থাৎ গাড়িপ্রতি একহাজার টাকা হারে উত্তোলন করে। এভাবে একেকজন মিডিয়াকর্মীর ভাগে রয়েছে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি গাড়ি।
একজন শ্রমিক নেতা অনেকটা অভিযোগের সুরে জানালেন, এনিয়ে নানা সময়ে সাংঘর্ষিক সম্পর্ক থেকে সাম্প্রতিক মিডিয়াকর্মীদের সাথে মাহিন্দ্র শ্রমিক ইউনিয়নের সস্পর্কের টানাপোড়ন দেখা দিয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট পরিবহন শ্রমিক সংগঠন কোনেভাবেই পেরে উঠছে না অতিব প্রভাব দেখানো এই মিডিয়াকর্মীদের সাথে। এমনকি ট্রাফিক বিভাগও যেনো অসহায়। এবিষয় সম্পর্কিত তথ্যাদি জানতে গত কয়েকদিন ধরে অনুসন্ধানে যা জানা গেলো, তা শুনে আক্কেলগুড়ুম অবস্থা!

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্রের দাবি, বরিশাল নগরী এবং নগরী থেকে বাইরে যাওয়া এবং আসা অন্তত ১২’শ মাহিন্দ্র ও সিএনজি নিয়ন্ত্রণ করে বরিশাল জেলা সিএনজি ও অটোরিকশা মালিক সমিতি ইউনিয়ন। রেজিস্ট্রিভুক্ত ইউনিয়নটি তাদের নিয়ন্ত্রিত গাড়িগুলো দেখভাল করার পাশাপাশি প্রতি গাড়ি থেকে মাসে বিশেষ অঙ্কের টাকা উত্তোলন করে শ্রমিক তহবিল তৈরী করে।
বিভিন্ন সময়ে দুর্যোগ এবং দুর্ঘটনায় আহত অথবা নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে ওই তহবিল থেকে অর্থসহায়তা দেয়া হয়। পাশপাশি শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষে বিভিন্ন পয়েন্টে থাকা শ্রমিকদের বেতন অনুসারে মাসিক পারিশ্রমিক দেয়া হয়। যতোটা জানা গেলো, ট্রাফিকদের সহায়তায় এই শ্রমিকদেরও ভুমিকা রয়েছে। মিডিয়ার একটি অংশ মাহিন্দ্র ও সিএনজি এবং অটোচালিত মোটরযান থেকে শ্রমিক ইউনিয়নের ব্যানারে অর্থ উত্তোলনের বিষয়টি সহজভাবে নিতে পারছে না।

অভিযোগ রয়েছে, এই টাকা উত্তোলনের কারণে শ্রমিক ইউনিয়নের কাছে আর্থিক সুবিধা চেয়ে দীর্ঘদিন ধরে বায়না ধরেছিলো। কিন্তু সাড়া না মেলায় প্রথমে তারা কোন গাড়ি ধরলেই সুপারিশ রাখতেন, এবং গাড়ি মালিকপক্ষ থেকে আর্থিক সুবিধা নিতেন। এখন প্রতিদিন সুপারিশ নয়, বরং তাদের পত্রিকা এবং ঢাকার মিডিয়ার প্রতিনিধিত্বকারী বিশেষ এই সংবাদকর্মীরা তাদের স্ব-স্ব অবস্থান থেকে শ্রমিক নেতৃবৃন্দের কাছে প্রকারান্তরে গাড়ি নাম্বারসহ একটি তালিকা ধরিয়ে দেয়. যাতে তাদের তালিকায় থাকা নম্বরধারী মাহিন্দ্র ও সিএনজি থেকে মাসিক চাঁদা উত্তোলন অথবা রিকুইজিশনের অন্তর্ভূক্ত করা না হয়।

ওই শ্রমিক নেতা জানান এবং বেশ কয়েকজন চালক স্বীকারও করেন, এরপর থেকেই সংবাদকর্মীরা তাদের সংশ্লিষ্ট মিডিয়ার স্টিকার এই গণপরিবহনগুলোর সামনে এবং পিছনে বিশাল আকারে সেটেঁ দেয়। মাঝেমধ্যে ট্রাফিক সার্জেন্টরা কাগজপত্র ত্রুটিপূর্ণ থাকায় ওই তালিকায় থাকা গাড়ি ধরলেই মিডিয়ার পরিচয়ে কখনো ওভার সেলফোনে শাসিয়ে কথা বলে গাড়ি ছেড়ে দেওয়ার একধরনের হুমকি ছুঁড়ে দেয়। কোনো কোনো নাছোড়বান্দা সার্জেন্ট এই হুমকি উপেক্ষা করে ত্রুটিপূর্ণ কাগজ এবং রংসাইডে চালানোর অভিযোগে মামলা জুড়ে দেয়াসহ ধরে নিয়ে আসলে স্বয়ং সেই মিডিয়াকর্মীরা উপাস্থিত হয়ে যান। নিজের গাড়ি বলে ট্রাফিক বিভাগের প্রধান উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি)র কাছে নিজের পরিচয় এমনভাবে জাহির করে, সুতরাং সহানূভূতির চোখে গাড়িটি ছেড়ে দেওয়া এবং মামলার ক্ষেত্রে জরিমানার অঙ্ক হ্রাস করা হয়।

আবার শোনা গেলো, মাসের শেষে শ্রমিক ইউনিয়নের পক্ষ থেকে মাসিক চাঁদার জন্য এধরনের গাড়ি আটকালেই আলোচনায় আসা এই সংবাদকর্মীরা নিজের পরিচয় দিয়ে কেনো গাড়ি ধরা হলো, তার কৈফিয়ত চান। পুলিশ ও শ্রমিকের একটি সূত্র জানায়, জেলা ও মেট্রো পুলিশের নৈশকালীন ডিউটিতে তাদের গাড়ি স্বল্পতায় রিকুজিশনের মাধ্যমে সিএনজি এবং অটোচালিত জান মাহিন্দ্র মাসিক চক্রবৃদ্ধি হারে প্রতিদিন অন্তত ৪০ টি প্রয়োজন হয়। সেক্ষেত্রে এই গাড়ি সংগ্রহের জন্য জেলা সিএনজি ও অটোরিকশা শ্রমিক সমিতি ইউনিয়নের দায়িত্বে কোন গাড়ি কোনদিন ডিউটিতে যাবে, তার তালিকা অনুসারে জেলা পুলিশ লাইনে পাঠানো হয়। সেক্ষেত্রে সংবাদকর্মীদের দেয়া তালিকায় থাকা গাড়ি ধরামাত্রই শুরু হয় ছাড়িয়ে নেওয়ার জোর-জবরদস্তিমূলক প্রভাব।