স্বামী হত্যার বিচার চেয়ে বরিশালে স্ত্রী’র সংবাদ সম্মেলন


২৪ ঘন্টা বার্তা   প্রকাশিত হয়েছেঃ   ৭ মার্চ, ২০২১

অনলাইন ডেস্ক :: বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ধামুরা বন্দর এলাকার গজেন্দ্র গ্রামে প্রফেসর নিরু রায়হানকে পরিকল্পিত ভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে নিহতের স্ত্রী সৈয়দা শাহিন আক্তার।

নিহত নিরু রায়হান (পূর্বের নাম নিরঞ্জন শীল নিরু) বরিশালের উজিরপুর উপজেলার ধামুরা গজেন্দ্র গামের মৃত: যোগেশ শীল এর পুত্র। সে বেসরকারি একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনের লিখিত বক্তব্যে স্ত্রী সৈয়দা শাহিন আক্তার বলেন, আমি চট্রগামে একটি এনজিওতে চাকুরীর সুবাদে সেখানে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় আমার সাথে সম্পর্ক হয়। ওই সময়ে আমি মুসলিম পরিবারের এবং আমার স্বামী হিন্দু ধর্মের ছিলেন। পরবর্তীতে ২০০১ সালে আমার স্বামী নিরু রায়হান ইসলাম ধর্মগ্রহণ করে ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক আমাকে বিবাহ করে। আমাদের একটি ছেলে সন্তান রয়েছে।

তিনি বলেন, আমার স্বামীর আরো তিন ভাই এরা হলেন অমল চন্দ্র শীল, বিমল চন্দ্র শীল, মনোরঞ্জন শীল। এছাড়াও তাদের পরিবারে এক ভাগিনা রয়েছে তিনি হলেন, সুশান্ত শীল শান্ত।

মূলত আমার স্বামীর সাথে গত চার পাঁচ বছর ধরে তাদের সাথে জমি জমা নিয়ে বিরোধ চলে আসছিলো। তারা কোন ভাবেই আমার স্বমীর সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে রাজি ছিলোনা। ভাইকে সম্পত্তি না দেওয়ার জন্য নানা তালবাহানা শুরু করে তার ভাইয়েরা ও ওই ভাগিনা।

আমার স্বামী নিরু রায়হান তার পিতার রেখে যাওয়া সম্পত্তি যা তার নামে বিএস পর্চা, রেকর্ড ও গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। অথচ তার তিন ভাই উক্ত সম্পত্তি না দেওয়ার জন্য বিভিন্ন রকম পায়তারা শুরু করে। তার পরিপেক্ষিতে গত ২০১৮ সাল থেকে ২০১৯ সালের ফ্রেব্রুয়ারি পর্যন্ত মোট ৬ বার আমার স্বামী তার নিজ বাড়ী উজিরপুরে আসা যাওয়া করে। এসময় তার ভাইদের সাথে ঝগড়া সহ হাতাহাতির ঘটনাও ঘটে।

২০১৯ সালের ফ্রেব্রুয়ারি মাসের ২৫ তারিখে বাড়িতে গিয়ে ২২দিন অবস্থানের পর তার সম্পত্তি বুঝে না নিয়ে সে ফিরবেনা। এবং এলাকার গন্যমান্য ব্যাক্তিদের নিয়ে বিচার শালিসি ডাকবে। পরে আমার স্বামীর ভাইয়েরা বুঝতে পারে এবার আর সম্পত্তি বুঝিয়ে না দিয়ে উপায় নেই। তখন তারা আমার স্বামীকে বলে পৈত্রিক সম্পত্তি বাইরের মানুষের কাছে বিক্রি করবি কেন? তোর সম্পত্তি আমরা কিনে রাখবো যার আনুমানিক মুল্য ১ কোটি টাকার মত। এবং তাদের কথা মতো দুই মাস পর কিছু টাকা (২২ লক্ষ) দিবে এবং বাকি টাকা একবছরের মধ্যে শোধ করবে।

পরবর্তীতে ২০১৯ সালের ১৭ এপ্রিল স্বামী নিরু রায়হান সেই জমি বিক্রির ২২ লক্ষ টাকা নিতে ভারত হয়ে ফেরার পথে উজিরপুরের নিজ বাড়ীতে ভাইদের কাছে যায়।

ঘটনার দিন ২০১৯ সালের ২১ এপ্রিল ৩.৪৫ মি. আমার স্বামীর ছোট ভাই মনোরঞ্জন শীল আমাকে ফোন করে জানায় এই মাত্র ভাই হারালাম। আমি আমার শ্বশুর বাড়িতে আসার আগেই আমার স্বামীর দাফন সম্পন্ন করে তারা।

ঘটনার ১২ দিন পর আমার মনে পরে আমার স্বামীর মানিব্যাগে থাকা ভোটার আইডি কার্ড, এটিএম কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স , ইউনির্ভাসিটির আইডি কার্ড, সাথে থাকা ৮০ হাজার নগদ টাকা, দুটি ব্যাংকের পাস বই, একটি স্মার্ট ফোন, সীম, বাড়ির দলিল, কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র, একটি চাবির ব্যাগ যেখানে আমাদের ঘরের প্রয়োজনীয় সব চাবি থাকে সেগুলো বুঝিয়ে দেয়নি। আমি আমার দেবর মনোরঞ্জন শীল ও ভাগিনা সুশান্ত শীল শান্তকে ফোন করি। তখন তারা আমাকে বলে তারা এগুলো পায়নি। এগুলো মনে হয় বর্ডারে মিছিং হয়ে গেছে। তখন আমার সন্দেহ হয়, আমি পিবিআইয়ের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে সেই ফোন নম্বরের সমস্ত তথ্য নেই। সেখানে আমার স্বামী আগের দিন রাতে তার সহকর্মী মোতালেব ভাই, বন্ধু মাহবুব ভাই এর সাথে দীর্ঘক্ষন আলোচনা করেন। এবং দেশে ঢোকার পর থেকে সেই সীম দিয়ে আমার দেবর মনোরঞ্জন, ভাশুরের ছেলে অঞ্জন শীল এবং বাড়িতে আমার স্বামীর এক বন্ধু সান্টু মিয়ার সাথে কথা হয়। আমার স্বামী মারা যায় ২১ এপিল বিকেল ৩.৪৪ মিনিটে সেই সীম বন্ধ হয় সেদিন বিকেল ৫.৪৫ মিনিটে। সীমটি ওই বাড়ীতে বসেই বন্ধ করা হয়। তাহলে মৃত মানুষ দুই ঘন্টা পর সেই সীম বন্ধ করলো কিভাবে ? তখন থেকে আমার সন্দেহ শুরু হয়।

নিরু রায়হানের মৃত্যুর পর আমার শ্বশুর বাড়ীর লোকজন চেয়ারম্যানের কাছ থেকে স্ত্রী’র নাম খালি রেখে মৃত্যুর সনদ পত্র তোলেন। আমার স্বামী বিয়ে করেনি, তার কোন ওয়ারিশ নেই এমনটা বুঝিয়ে তারা ভূমি অফিসে এটাই প্রমাণ করতে চেয়েছিলেন।

এই ঘটনার ৮ মাস পরে আমি বরিশালে আমার স্বামীর বাড়িতে আসি তার প্রাপ্ত সম্পত্তি বুঝে নিতে। সেখানে আমার শ্বশুর বাড়ীর লোকজন আমাকে ও আমার ছেলেকে অস্বিকার করে এবং আমার ছেলের জীবনের উপর হুমকী দেয়। এর পরিপেক্ষিতে আমি উজিরপুর থানায় গত ২০২০ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি একটি সাধারণ ডায়রি করি।

২০২০ সালের করোনাকালীন সময়ে লকডাউন থাকায় মামলা দায়ের করতে বিলম্ব হয়। পরবর্তীতে পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে আমি ২০২০ সালের ১২ অক্টোবর বরিশাল বিজ্ঞ সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালতে ৮ জনের নামে একটি হত্যা মামলা দায়ের করি। মামলার আসামীরা হলেন- অমল চন্দ্র শীল, বিমল চন্দ্র শীল, মনোরঞ্জন শীল, সুশান্ত শীল শান্ত, কনা রানী শীল, মিথুন জয় দীপ, অর্পিতা রানী টুম্পা, অঞ্জন শীল। উক্ত মামলায় বিজ্ঞ আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে সিআইডিকে তদন্তের নির্দেশ দেন। মামলাটি বর্তমানে সিআইডিতে তদন্ত চলছে। উক্ত মামলায় আগামী ৮ মার্চ আমার স্বামীর লাশ ডিএনএ ও ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য লাশ উত্তোলন করবে।

এদিকে আমার দেবর মনোরঞ্জন শীল বরিশালের আগৈলঝাড়ার যুব উন্নয়ন অফিসে কর্মরত ছিলেন। হত্যা মামলা করার কথা শুনে সে চাকুরী থেকে অব্যাহতি নিয়েছে। আমি জানতে পেরেছি তারা সমস্ত সম্পতি বিক্রি করে দেশ ত্যাগ করার পরিকল্পনা করছে।

সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তিনি প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’র কাছে হত্যাকারীদের গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমুলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে তিনি স্বামীর প্রাপ্য সম্পত্তি যাতে তার ছেলে পায় তারও জোর দাবি জানান। অন্যথায় আমার ছেলের ভবিষৎ অণিশ্চয়তার মধ্যে পরবে।